মহুয়ার দেশ কবিতার বড় প্রশ্ন ও উত্তর || দ্বাদশ শ্রেণীর বাংলা সাজেশন 2021

   দ্বাদশ শ্রেণীর জন্য নির্বাচিত অন্যতম কবিতা মহুয়ার দেশ, কবিতাটি কবি সমর সেন রচিত, এই কবিতা থেকে যে সকল বড় প্রশ্ন গুলি পরীক্ষাতে বারবার আসে সেই সকল প্রশ্ন গুলি এখানে উত্তর ও তার আলোচনা করা হল। 


    সমর সেন রচিত মহুয়ার দেশ কবিতা খানি তার কয়েকটি কবিতা কাব্যগ্রন্থ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এই কবিতাখানি তিনি মাত্র 21 বছর বয়সে রচনা করেছিলেন।



মহুয়ার দেশ কবিতার প্রেক্ষাপট : 


     একদিকে নাগরিক সভ্যতা অন্যদিকে সবুজ প্রকৃতির মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া নাগরিক জীবন এই দুধের স্বাদ পেয়েছিলেন ব্যক্তিগত জীবনে কবি সমর সেন। তিনি যান্ত্রিক বা নাগরিক সভ্যতা কে গ্রহণ করতে চাননি, সর্বদা তিনি সবুজ প্রকৃতিকে লালিত করেছেন নিজের মধ্যে, এই কারণে শহরের যন্ত্রের কালো ধোঁয়া তার কাছে দুঃস্বপ্নের মতো মনে।


    স্বাধীনচেতা কবি সমর সেন নাগরিক দুঃস্বপ্নকে মহুয়ার দেশের ক্লান্ত পরিশ্রম এর বিপরীত করে করে তুলেছেন। কবির কাছে মহুয়া দেশের সবুজ প্রকৃতির ক্লান্তি ও যেন এই দূষণের নগরী থেকে অনেক ভালো, এই প্রেক্ষাপটকে অবলম্বন করে কবি মহুয়ার দেশ কবিতা খানি রচনা করেছেন।



মহুয়ার দেশ কবিতার বিষয়বস্তু :


     কবি সমর সেন রচিত মহুয়ার দেশ কবিতাটি তে আমরা দুটি বিপরীত শব্দ তাকে লক্ষ্য করতে পারি। একদিকে তিনি নগরীরের যান্ত্রিক সভ্যতা আর তার বিপরীতে তিনি তুলে ধরেছেন অনেক দূরের সবুজ ঢাকা মহুয়ার দেশের সভ্যতা কে। 


    যান্ত্রিক সভ্যতা নগরকে কলুষিত করার পর তা ধীরে ধীরে বহুদূরের সবুজ বনানীতে পাড়ি জমিয়েছে, তাই কবিতায় তিনি মহুয়ার দেশের বিপন্ন অবস্থা কে তুলে ধরেছেন। বিকালের পড়ন্ত সূর্যের আলোয় তার কাছে জলের ফেনা গলি গলি তো সোনা বলে মনে হয়েছে। কিন্তু তারই উপরে ধীরে ধীরে বিরাজ করে অন্ধকার কালো ধোঁয়া। 


    এরই বিপরীতে কবির মনে পড়েছে অনেক দূরের মেঘে ঢাকা ক্লান্তিময় মহুয়ার দেশের কথা, সমস্ত খন যেখানে পথের দুধারে বড় বড় শাল আর দেবদারু এক রহস্য সৃষ্টি করেছে। কবি নিজেকে এই রহস্যের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ে ক্লান্তি খুঁজে পেতে চেয়েছেন যেখানে মহুয়ার ফুল হবে তার অবসরের একমাত্র সঙ্গী।


    তবুও কবির যেন শান্তি নেই কারণ, এই নিবিড় রহস্যে ঘেরা অন্ধকারেও তাকে মাঝে মাঝে যান্ত্রিক সভ্যতার শব্দ ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। কবির চোখে ধরা পড়েছে এই সভ্যতার কিছু মাটির মানুষকে যাদের শরীরে ধুলোর কলঙ্ক আর চোখে ক্লান্ত দুঃস্বপ্ন। 




মহুয়ার দেশ কবিতার বড় প্রশ্ন ও উত্তর :




"আমার ক্লান্তির উপর ঝরুক মহুয়া ফুল, / নামুক মহুয়ার গন্ধ।" - এখানে আমার বলতে কার কথা বলা হয়েছে ? বক্তার এমন ইচ্ছার কারণ আলোচনা করো। 



     আলোচ্য উদ্ধৃতিতে আমার বলতে মহুয়ার দেশ কবিতার কবি সমর সেন এর কথা বলা হয়েছে।


    কবি সমর সেনের জীবনে যখন কালো ধোঁয়ায় ঢাকা নাগরিক সভ্যতা বিরাজ করেছে ঠিক তখন তিনি খুঁজে পেতে চেয়েছেন এক শান্ত ক্লান্তিময় সভ্যতা কে। আর তখনই তার মনে পড়েছে মহুয়ার দেশের কথা। যে যান্ত্রিক নাগরিক সভ্যতা তার জীবনে দুঃস্বপ্ন সৃষ্টি করে সেখানে সে থাকতে রাজি নয়। 


    তাই তিনি খুঁজে পেতে চেয়েছেন এক বন্ধনহীন ক্লান্তময় প্রকৃতিকে যেখানে শীতের রাতের স্বপ্নগুলো দুঃস্বপ্নে পরিণত না হয়। তিনি ফিরে যেতে চেয়েছেন দীর্ঘ শাল আর দেবদারুর রহস্যেঘেরা মহুয়ার দেশে, যেখানে এই নাগরিক সভ্যতার যন্ত্র থেকে তিনি মুক্তি পেতে পারেন। কবি এই কারণে কল্পনা করেছেন তার অবসর যাপন আর ক্লান্তিময় সময়ের সাক্ষী থাকবে একমাত্র মহুয়ার ফুল।


    মহুয়ার ফুলের মাদকতায় তিনি নিজেকে মিশিয়ে দিতে চান এক নিস্তব্ধতা প্রকৃতির সাথে, তাই তিনি লিখেছেন -" আমার ক্লান্তির উপরে ঝরুক মহুয়া ফুল / নামুক মহুয়ার গন্ধ" । কিন্তু কবির এই আবেদন যেন বাস্তবে রূপ পায়নি। কারণ তিনি নাগরিক সভ্যতা তে থেকেও সেই মেঘ মোদির মহুয়ার দেশ এর বিপন্নতাকে অনুভব করেছেন।


    কবি সমর সেনের একান্ত ইচ্ছা অগ্রাসি নগরের কাছে তিনি নিজেকে বিলিয়ে দিতে চান না। এই কারণে তিনি বহুদূরে মহুয়ার দেশে ফিরে যেতে চেয়েছেন। কারণ তার মনে হয়েছে একমাত্র মহুয়ার দেশ তার ক্লান্তিকে দূর করতে পারে, তার শীতের রাতের দুঃস্বপ্নগুলো কে সুন্দর স্বপ্নে পরিণত করতে পারে।




"ঘুমহীন তাদের চোখে হানা দেয় / কিসের ক্লান্ত দুঃস্বপ্ন।" - আলোচ্য লাইনটিতে কাদের কথা বলা হয়েছে ? তাদের ঘুমহীন চোখে ক্লান্ত দুঃস্বপ্ন হানা দেয় কেন ? 



     উল্লিখিত লাইনটিতে তাদের বলতে কবি সমর সেন মহুয়ার দেশের কয়লা খনির শ্রমিকদের কথা বলেছেন। 


    কবি সমর সেন যখন যান্ত্রিক সভ্যতার কালো ধোঁয়ায় নিজেকে বিপন্ন বলে মনে করেছেন, ঠিক তখন তিনি তার ক্লান্ত জীবনকে খানিকটা স্নিগ্ধতা দেওয়ার জন্য যেতে চেয়েছেন অনেক দূরের মহুয়ার দেশে। তার কাছে মহুয়ার দেশ অনেকটা স্বপ্নের আবেশ এর মত বলে মনে হয়েছে।


    যে স্বপ্নের মহুয়ার দেশে তিনি দীর্ঘ শাল আর দেবদারু গাছের নিচে মহুয়া ফুলের গন্ধে শরীরকে ক্লান্তি দিতে চান, সেখানে তিনি যেতে চাইছেন কারণ নাগরিক সভ্যতা কে তিনি আর সহ্য করতে পারছেন না। নাগরিক সভ্যতায় শীতের রাতের স্বপ্ন গুলো যেন কবির কাছে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।


    কবি যেন গভীর রাতে শুনতে পেয়েছেন সেই বহুদূরের মহুয়ার দেশের ক্লান্ত স্বপ্নগুলোর মাঝেও যেন কয়লাখনির গভীর শব্দ, যে শব্দ কবিকে আরো বেদনাময় করে তুলেছে। কারণ তিনি অনুভব করেছেন যান্ত্রিক সভ্যতা শুধু নগরে নয় ধীরে ধীরে সেখানেও পৌঁছে গিয়ে শান্ত সভ্যতাকে গ্রাস করতে শুরু করেছে।


    মহুয়ার দেশের এই বিপন্ন অবস্থা তে কবি অনুভব করেছেন শিশির ভেজা সবুজ সকালে মহুয়ার দেশের মানুষদের অবসন্ন শরীরে যেন লেগে আছে ধুলোর কলঙ্ক। তাদের বাস্তব জীবনের স্বপ্ন গুলো যেন আজ দুঃস্বপ্নে পরিণত। যন্ত্র সভ্যতার যে আবাহন তা যেন তাদের ঘুমহীন চোখে দুঃস্বপ্ন এঁকে দিয়েছে।




মহুয়ার দেশ কবিতায় কবি মহুয়ার দেশের যে চিত্র অঙ্কন করেছেন তা বর্ণনা করো।



    কবি কল্পনা কাব্য রচনার অন্যতম বিষয়, কারণ কবির কল্পনা কোন কাব্যের আলংকারিক অর্থ দান করে, আর পাঠকের সেই কাব্য লোকে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। আলোচ্য মহুয়ার দেশ কবিতাটিতে কবি সমর সেন ঠিক একই রকমভাবে আমাদের  মহুয়ার দেশে নিয়ে গেছেন। 


    বস্তুতপক্ষে মহুয়ার দেশের চিত্র যে কবি কল্পনায় অন্য কোন বিচিত্র রূপ লাভ করেছে তা নয়, মহুয়ার দেশ তা যেন কবিতায় আপন মহিমায় আমাদের সামনে ফুটে উঠেছে। নগরকেন্দ্রিক যান্ত্রিক সভ্যতা থেকে কবি যেহেতু মুক্তি পেতে চেয়েছেন তাই তার মুক্তির অন্যতম স্থান হয়ে ধরা দিয়েছে তার কাব্য লোকের এই মহুয়ার দেশ টি। 


    সেই কারণে সাধারণভাবেই মহুয়ার দেশ কে তিনি কবিতাতে অসাধারণ ভাবে চিত্রিত করেছেন। মহুয়ার দেশ এর শুরুতে তিনি বর্ণনা করেছেন সমস্ত রাস্তার দুধারে দীর্ঘ প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে থাকা দেবদারু গাছের দীর্ঘ রহস্য কে।  যে রহস্যের জন্ম হয়েছে অরন্যের গভীরতা থেকে, যাকে তিনি নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা তে খুঁজে পাননি। 


    গভীর মহুয়ার বন, কালো কয়লা খনি, সেখানকার মানুষের অবসন্ন শরীর, শরীরে লেগে থাকা ধুলোর কলঙ্ক, আর তাদের ক্লান্ত ঘুমহীন চোখ যেন মহুয়া দেশের অনন্য চিত্র দান করেছে। এই মহুয়ার দেশের কাছে কবির একমাত্র আক্ষেপ তার ক্লান্তিকে নিবারণ করবে শুধু মহুয়ার ফুল, কবি কল্পনায় মহুয়ার দেশের এই চিত্রটি যেন অনাবিল কল্পলোকের বাস্তবতা। 




কবি সমর সেন রচিত মহুয়ার দেশ কবিতা টির লেখন শৈলীর পরিচয় দাও ।



    কবির মনের ভাব প্রকাশ করার অন্যতম পীঠস্থান হলো কবিতা, তাই কবিতা সকল কবির নিজস্ব ভঙ্গিমায় গড়ে ওঠে। এই যে কবিদের / লেখকদের নিজস্ব ভঙ্গিমা তাকে আমরা বলি কাব্য ভঙ্গি বা স্টাইল বা শৈলী। এই শৈলী কথাটি সাধারণত ইংরেজী স্টাইল / Style কথাটি থেকে এসেছে। যেকোনো কাব্যগ্রন্থের বা কবিতার একটি নির্দিষ্ট স্টাইল / শৈলী থাকে। আমরা সমর সেন রচিত মহুয়ার দেশ কবিতাটি পাঠ করলে বুঝতে পারি যে এটি অন্য কোনো সাধারণ কবিতার মত ভঙ্গিমাতে লেখা নয়। 


    কাব্য রচনার যে সমস্ত শৈলী আছে তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো গদ্য কবিতা, কবি সমর সেন রচিত মহুয়ার দেশ কবিতাটি এই শৈলী যুক্ত 22 টি পংক্তিতে রচিত একটি কবিতা। আসলে কবিতার ভাবের উপর নির্ভর করে কবিতার এই শৈলী নির্ভর করে। কবি সমর সেন যেন কবিতাটিকে কবিতার বন্ধন থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছেন সেই কারণে অনেকটা রীতি নিয়মকে ত্যাগ করে কবিতাটি লিখেছেন। 


    কবি সমর সেন মহুয়ার দেশ কবিতাটি কে ব্যঞ্জনা ধর্মী করে তোলার জন্য খুব সাবলীল ভাবে কবিতাতে নতুন টেকনিক ব্যবহার করেছেন। যেখানে কবিতার অর্থ শুধু বক্তব্যধর্মী নয় তা চিত্রকল্পের সঙ্গে ব্যঞ্জনা ধর্মী করে তুলতে সাহায্য করেছে। তাই আদ্যোপান্ত পাঠ করার পর কবিতা তে আমরা দেখতে পাই এক গদ্যের রঙে তিনি কবিতাটিকে রাঙিয়ে তুলেছেন।


   সেই কারণে স্বাভাবিকভাবেই আমরা মহুয়ার দেশ কবিতাটি কে গদ্য কবিতা বলতে পারি। আসলে এই লক্ষণগুলি আধুনিক যুগের ফসল বলে তাদেরকে খুব সূক্ষ্মভাবে সাহিত্যের আঙ্গিনায় বাধা কঠিন। তবুও সমর সেনের মহুয়ার দেশ কবিতাটি কে আমরা একটি যথার্থ গদ্য কবিতা বলতে পারি।



বাংলা বিষয়ের অন্য সকল প্রশ্ন উত্তর ::




মহুয়ার দেশ কবিতার বড় প্রশ্ন ও উত্তর