ক্যান্টন বাণিজ্য বলতে কী বোঝো? এর বৈশিষ্ট্য গুলি আলোচনা করো।

      দ্বাদশ শ্রেণীর ইতিহাস বিষয় থেকে যেসকল প্রশ্নগুলি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এখানে সেই সকল প্রশ্ন নিয়ে নোট আকারে আলোচনা করা হয়েছে। দ্বাদশ শ্রেণীর অন্যান্য বিষয়ের সকল নোট এখানে আলোচনা করা হয়। 

   ইতিহাস বিষয় থেকে পরপর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আলোচনা করা হলো যেখানে এই পোস্টটি তে ক্যান্টন বাণিজ্য বলতে কী বোঝো? এর বৈশিষ্ট্য গুলি আলোচনা করো, প্রশ্নের বিষয়টিকে এখানে গুরুত্ব সহকারে আলোচনা করা হলো।


ক্যান্টন বাণিজ্য বলতে কী বোঝো


     চীনের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত ক্যান্টন বন্দর তাং যুগ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিল। প্রাচীন যুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত ক্যান্টন ছিল চীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। নানকিং এর সন্ধির (1842 খ্রিস্টাব্দ) আগে পর্যন্ত গোটা চীন বিদেশীদের কাছে রুদ্ধ থাকলেও একমাত্র ক্যান্টন ছিল বিদেশীদের কাছে উপযুক্ত বন্দর।

ক্যান্টন বাণিজ্যের বৈশিষ্ট্য
ক্যান্টন বাণিজ্য


    চিনা আদালত 1959 খ্রিস্টাব্দে এক নির্দেশনামার দ্বারা একমাত্র ক্যান্টন বন্দরকে বিদেশী বাণিজ্যের জন্য খুলে দেয়। এভাবে ক্যান্টন বন্দরকে কেন্দ্র করে চিনে বিদেশিদের এক বন্দর কেন্দ্রিক যে বাণিজ্য প্রথার সূচনা হয় তা ক্যান্টন বাণিজ্য প্রথা নামে পরিচিত। এই প্রথা 1842 খ্রিস্টাব্দে নানকিং এর সন্ধিতে স্বাক্ষরিত হয়। ক্যান্টন বাণিজ্যের প্রথম পর্বে পর্তুগিজরা এবং পরে ব্রিটেনসহ অন্যান্য ইউরোপীয় জাতিগুলি নিজেদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে।


ক্যান্টন বাণিজ্যের বৈশিষ্ট্য

ক্যান্টন বাণিজ্যের যে সমস্ত বৈশিষ্ট্য গুলি আছে সেগুলি হল যথা —

রুদ্ধদ্বার নীতি :-   ক্যান্টন বাণিজ্যে অংশগ্রহণকারী বিদেশী বণিকদের চীনা ভাষা ও আদব কায়দা শেখা নিষিদ্ধ ছিল। তারা ক্যান্টনে চিনা ফৌজদারি ও বাণিজ্যিক আইন মেনে চলতে বাধ্য ছিল। বিদেশি বাণিজ্য গুলিতে মহিলা ও আগ্নেয় অস্ত্রের প্রবেশ,দাসি নিয়োগ প্রভৃতি নিষিদ্ধ ছিল। বাণিজ্য মৌসুম শেষে ক্যান্টনে আসা বিদেশী বণিকদের এই বন্দর ছেড়ে চলে যেতে হয়। চীনে বিদেশী বণিকদের প্রতি এই কঠোর নীতি রুদ্ধদ্বার নীতি নামে পরিচিত।

মূল শহরে প্রবেশে বাধা :-   ক্যান্টন বন্দর বাণিজ্য করতে আসা ইউরোপীয় বণিকরা শহরের প্রধান ফটকের বাইরে একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসবাস ও বাণিজ্যিক কার্যকলাপ চালাতে বাধ্য হতো। তাদের কখনো প্রধান ফটক অতিক্রম করে মূল শহরে প্রবেশের অনুমতি ছিল না। তাই বণিকরা ক্যান্টন শহরের প্রাচীর এর বাইরে বাস করলেও তাদের স্ত্রী সন্তানদের রেখে আসতে হতো ম্যাকাওতে।

কো-হং প্রথা :-   বিদেশি বণিকরা চীনের ক্যান্টন বন্দরে এসে স্বাধীনভাবে বা সরাসরি এখানকার বাণিজ্য অংশ নিতে পারত না। কেননা বিদেশী বণিকদের কোন অবস্থাতেই চীনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে দেওয়া হতো না এমনকি কোন বণিকদের কাছ থেকেও সস্তায় তাদের মাল কেনার অধিকার ছিল না। তাই চীনা সরকার একমাত্র কো-হং নামক বণিক সংস্থাকে একচেটিয়া বাণিজ্য করার অধিকার দিয়েছিল এবং বিদেশি বণিকরা ক্যান্টন বন্দরে এসে একমাত্র কো-হং বণিকের কাছ থেকে মাল কিনতে বাধ্য ছিল।

কো-হং দের দুর্নীতি :-   ক্যান্টনে একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার পেয়ে কো-হং বণিকরা অত্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে একচেটিয়া অধিকার পাওয়ার জন্য তারা চীনা অধিকর্তা,শুল্ক অধিকর্তাকে আদালতে বিপুল অর্থ দিত এর ফলে বাণিজ্যের বেশিরভাগ লভ্যাংশ কো-হং বণিকরা আত্মসাৎ করত।

ব্যক্তিগত বাণিজ্য :-   ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের বণিকরা চীনের ক্যান্টন বন্দরে যে বাণিজ্য করতো তা ছিল মূলত ব্যক্তিগত মালিকানা ভিত্তিক বাণিজ্য। এই বাণিজ্যের জন্য চীনের সঙ্গে বিদেশী বণিকদের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল না।

ব্রিটিশ বণিকদের প্রাধান্য :-   ক্যান্টন বাণিজ্যের প্রথমদিকে পর্তুগিজরা প্রবেশ করলেও পরবর্তীকালে ব্রিটিশ বনিকরা এই বাণিজ্যের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। ক্যান্টনে ব্রিটিশ বণিকদের চায়ের বাণিজ্য ছিল সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও তারা রেশম,মৃৎপাত্র,দারচিনি,ঔষধপত্র প্রভৃতি ইংল্যান্ডে রপ্তানি করত আর তারা ইংল্যান্ড থেকে পশম বস্ত্র,লোহা,সিসা প্রভৃতি চীনে আমদানি করতে। চীনের সাথে ইংল্যান্ডের এই বাণিজ্য ‘দেশীয় বাণিজ্য’ নামে পরিচিত ছিল।

উপসংহার :-   সুতরাং,পরিশেষে বলা যায় যে ব্রিটিশ বণিকরা 19 শতকের প্রথম দিকে ভারত থেকে চোরাই পথে চীনে আফিম রপ্তানি করতে থাকে। যার ফলে ক্যান্টন বাণিজ্যের চরিত্র বদলাতে থাকে। তাই আফিমের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে চীনের সাথে বৃটেনের বিরোধের ফলে প্রথম আফিম যুদ্ধ বা প্রথম ইঙ্গ চীন যুদ্ধ (1839-1842 খ্রিস্টাব্দ) সংগঠিত হয়। এই যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে ক্যান্টন ব্যবসা ভেঙে পড়ে।

দ্বাদশ শ্রেণীর ইতিহাস বিষয়ের অন্য সকল প্রশ্ন ও উত্তর :